আন্তর্জাতিক

১৫ বছর ছাগল চড়ানোর অর্থে হজ পালন

  প্রতিনিধি ২৯ এপ্রিল ২০২৩ , ৪:১৩:৩৬

শেয়ার করুন

১৫ বছর ছাগল চড়ানোর অর্থে হজ পালন

নাম আবদুল কাদের। কারাসা বালুচ পাকিস্তানের অধিবাসী। থাকেন পরের জমিতে ঝুপড়ি বানিয়ে। ঝুপড়ির বেড়া দিয়েছেন ঝাউ জাতীয় কাঁটাদার গাছ দিয়ে। একদম প্রান্তিক অজপাড়া গাঁ। নেই কোনো বিদ্যুতের ঝলমল। বুঝেন না মোবাইল কী? নেই নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। কিন্তু রবের সাথে সম্পর্ক নিবিড়। বুকে আশার বাসা বেঁধে রেখেছেন বায়তুল্লাহর জিয়ারত করবেন। তাওয়াফ করবেন কাবার চারপাশে। নবীয়ে রহমতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে সালাম পেশ করবেন। পান করে সিক্ত হবেন জমজম। দেখবেন মিনা আরাফাত। দৌড়বেন সাফা মারওয়ায়। আরো কতশত স্বপ্ন বুনে রেখেছেন হৃদয় জুড়ে।

কিন্তু আশা করলেই তো আর দূর দেশে আরব সাগর পাড়ি দিয়ে নবীর দেশে যাওয়া যায় না। প্রয়োজন হয় অর্থের। স্বাদ থাকলেই তো আর মিঠানো যায় না। থাকতে হয় সাধ্যের মধ্যে। কিন্তু এই আশা তো সাধ্যের চেয়ে অনেক উর্ধ্বে। তবে প্রেম ভালোবাসার স্বাদ যত উর্ধ্বের হোক। মানে না সাধ্যের বাঁধা। অতিক্রম করে সিক্ত হয় প্রেমের অমিয় সুধায়।

বাবাজি আবদুল কাদের একজন সাধারণ রাখাল। অন্যের ছাগল লালন-পালন করে দিন করেন গুজরান। হজের জিয়ারতের ভাসনা কীভাবে মিঠাবেন? একজন রাখালের পক্ষে তো অসম্ভব। সারা বছর ছাগল পালন করার পর এলাকার নিয়মমাফিক বছর শেষে মালিকের পক্ষ থেকে পারিশ্রমিক হিসেবে মিলে মাত্র একটি ছাগল ছানা। থাকার ঘর নেই। সংসার চালানোর যোগান হয় না ঠিক মতো। কিন্তু রবের ভালোবাসা যে পূরণ করতেই হবে।

এই ইচ্ছেশক্তি নিয়ে শুরু করলেন টাকা জমানো। কয়েক বছর রাখালি করে কয়েকটি ছাগল জমালেন। তা বিক্রি করে বানালেন পাসপোর্ট। কিন্তু হায়! উপযুক্ত অর্থ জমানো পর্যন্ত পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলো।

পিছপা না হয়ে আবারো ছাগল জমাতে শুরু করেন। দীর্ঘ পনেরো বছর রাখালি করে ছাগল লালন-পালন করে জমানো টাকা দিয়ে শেষ-মেষ উমরাহ পালনের অর্থ কোনোভাবে জমেছে। তাও শুধু নতুন পাসপোর্ট যাতায়াত ভাড়া ও সামান্য হাত খরচ। নেই হোটেলে থাকার ভাড়া। তার জমানো অর্থ পরিমাণ কোনো হজ এজেন্সির কাছে কোনো প্যাকেজ তো দূর ধারে কাছেও নেই। তাই স্থীর করেছেন একা যাবেন। পড়ে থাকবেন কাবা চত্বরে বা আশপাশের কোথাও।

১৪৪৪ হিজরী এই রমজানে মাসে ইতিহাস রচনাকারী আল্লাহ প্রেমীদের সমাগম হয়েছে। রিপোর্ট বলছে শুধু রমজানে ৫০ লাখ মানুষ উমরাহ পালনের জন্য সৌদি গমন করেছেন। পাকিস্তানের এই বাবাজি আবদুল কাদেরও একজন। কিন্তু সবার থেকে আলাদা। সাথী নেই। নেই এজেন্সিও। চিনেন না অযুখানা বাথরুম বা অযু ইস্তেঞ্জার জায়গা। জানেন না আরবি ভাষা। এমনকি নেই উর্দু ভাষার সাথেও দূরতম সম্পর্ক। কথা বলেন আঞ্চলিক বালুচ ভাষায়। খাবার হিসেবে হারামে পাকে যা ইন্তিজাম আছে তাই যথেষ্ট। অযু করবেন অযুখানা চিনেন না। পাশের দোকান থেকে এক বোতল পানি নিয়ে অযু সেরেছেন। পরে কেউ দেখিয়ে দিলেন নিচেই আছে সব।

একজন দুইজন এভাবে সবার নজরে আসতে থাকেন আবদুল কাদের নামের বালুচী এই রাখাল বাবাজি। একে একে সবাই। বাবাজি আবদুল কাদেরের ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়তে লাগল আরব মিডিয়া থেকে নেট দুনিয়ায়। মুহূর্তেই ভায়রাল কাবার অঙ্গিনায় তার হাঁটাচলার দৃশ্য। কিন্তু তার কোনো খবরই নেই ঐসব কিছুর। ভূপৃষ্ঠে কতশত অখ্যাত অপরিচিত মানুষ আল্লাহর কাছে খুব পরিচিত প্রিয়। কখনো কখনো দুনিয়াবাসির কাছেও প্রিয় হয়ে যান।

না হয় এই রমজানে উমরাহ পালন করেছেন কত রাজা বাদশাহ আমীর উমারাহ! কতশত উযির নাযির মন্ত্রী মিনিস্টার! সবাইকে পিছে পেলে ছাগল চড়ানোর সাধারণ রাখাল আলোচনায় সবার শীর্ষে। কেউ বলছেন ফেরেশতা সিফাত ইনসান। কেউ বলছেন দরবেশ। কেউ বলছেন সাহাবাদের যুগের মানুষ। কেউ কাছে এসে দোয়ার আবেদন করছেন। হাদিয়া দিচ্ছেন। ছবি তুলছেন ভিডিও বানাচ্ছেন। কিন্তু তিনি মজে আছেন রবের প্রেমে।

আবদুল কাদের বাবাজি কে ঘিরে মানুষের এই আলোচনা পৌঁছে গিয়েছে রাজ প্রাসাদের রাজ পরিবারের সদস্যদের কাছে। কোনো এক রাজপুত্র বিডিও বার্তায় তাঁর তালাশির সংবাদ জানালেন। রাজকীয় মর্যাদায় শাহী মেহমান বানাতে চেয়ে আশা ব্যক্ত করেছেন। ততক্ষণে আবদুল কাদের বাবাজি বালুচের বালুভূমির সেই ঝুপড়িতে ফিরে গেছেন।

তালাশ করে খুঁজে পেলেন তিনি একজন পাকিস্তানী। দেওয়া হলো দাওয়াত। ঘোষণা করা হলো রাজকীয় মর্যাদায় মেহমানদারির। অফার করা হয়েছে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৪৪৪ হিজরীতে হজের জিয়ারতের। আল্লাহু আকবার।

আল্লাহর প্রেম দরিয়ায় ডুব দিয়ে চেয়েছিলেন সমান্য একজন ভিখারি বেশে হলেও একটু হাজিরা দেওয়ার আল্লাহ পাক কবুল করে নিলেন মেহমান হিসেবে। ব্যবস্থা করে দিলেন রাজকীয় মর্যাদায় মেহমানদারির।
আল্লাহর প্রতি তাঁর ঘর ও নবীয়ে রহমতের দোরগোড়ায় হাজিরা দেওয়ার এমন আকুতি আল্লাহ পাক সবাইকে দিন। আমিন


শেয়ার করুন