প্রতিনিধি ১ জুন ২০২৪ , ১০:৪৩:২৪
-স্যার, একজন ভদ্রমহিলা এসেছেন। বললেন, আপনার মা।
-বলে দাও আমি অফিসে নেই।
-কিন্তু স্যার, আমি তো বলেছি, আপনি অফিসেই আছেন। সেজন্যই ডাকতে এসেছি।
-শফিকুর, তুমি আসলেই একটা আহাম্মক। আমাকে না জানিয়ে আমার কোনো ব্যাপারে তথ্য দিলে পরেরবার থেকে বসের কাছে কমপ্লেইন দেবো। বিষয়টা মাথায় থাকে যেন।
শফিকুর কিছুটা হতভম্বের মত মার্কেটিং অফিসার সাইদুরের দিকে চেয়ে থাকে। মায়ের কাছে সন্তানের খবর দেওয়াটা এতই আহাম্মক! ভেবে পায় না সে। “সরি স্যার” বলে চা বানাতে চলে যায় সে। এই অফিসে চা বানানো, কোন স্যারের কী লাগবে, ওই হিসাবটুকু রাখাই সীমাবদ্ধতা তার।
সাইদুর অফিসের কম্পিউটার বন্ধ করে ওয়েটিং রুমে ঢোকে। সোফার এককোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে তার মা সায়রা বানু আর সতেরো বছরের ছোট ভাই মিনারুল। “কেমন আছো” জিজ্ঞাসা করার সাহস তার নেই। পোষা প্রানীটির মত পায়ের পাশে গিয়ে শুধু চুপচাপ বসে রইলো।
মা একটাবার দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
-মাসে মাসে ছোট ভাইয়ের কাছে টাকা পাঠিয়েই দায়িত্ব পালন হয়ে যায় বাবা?
ধরা পড়া চোরের মতন সাইদুর জবাব দেয়,
-আসলে অফিসে এত কাজের চাপ, মা। ঈদে যে বাড়ি যাবো, খামোখা কাজ বন্ধ করে লাভ আছে বলো?
-তাই বলে গত বছর কুরবানির ঈদেও তুই বাড়ি যাসনি। এবারও এত দেরি করছিস। সত্যি করে বল দেখি, এবারও কী বাড়ি আসতিস?
সাইদুর জবাব দেয় না। মা আবার বললেন,
তোর কীসের এত কাজের চাপ বাবা? কত কাজ তোর? আমি তোর স্যারের সাথে কথা বলবো। ওই যে পিওন ছেলেটাকে দিয়ে খবর পাঠিয়েছি। আজ রাতেই তোর অফিস ছুটি। এরপরেও তোকে কেন কাজ করাবে?
সাইদুর ভয় পেয়ে যায়। বস যদি আসল সত্যিটা জানতে পারেন, তবে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে৷ কিন্তু কিছু করে ওঠার আগেই বস এসে হাজির। সাইদুরের দিকে ভয়ংকর দৃষ্টিতে তিনি চেয়ে আছেন।
মা শান্ত স্বরে বসকে জিজ্ঞাসা করলেন,
-ঈদে সবার ছুটি হয়, আমার ছেলের কেন হয় না বাবা?
বস একপলক মায়ের দিকে, আরেক পলক সাইদুরের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন,
-আমি সাইদুরের সাথে কথা বলছি, মা। আপনি চিন্তা করবেন না।
এই বলে তিনি ইশারা করে সাইদুরকে বাইরে ডেকে নিলেন। সাইদুর লজ্জায় মাথা নিচু করে আছে। বস জিজ্ঞাসা করলেন,
-আসল বিষয়টা কী সাইদুর?
-বস, গত দশ বছর আগে আমরা শেষ কুরবানি দিয়েছিলাম। তখন বাবা বেঁচে ছিলেন। এরপর থেকে সংসারের অভাব, আমার পড়াশোনা। আমার আজও মনে আছে, বাবা মারা যাবার তিন বছর পর যে কুরবানির ঈদ এসেছিলো, আমার মায়ের পরনে পুরনো ছেঁড়া শাড়ি। কেউ এক টুকরো মাংস দেয়নি এই ভেবে, আব্বা হয়তো অনেক টাকাপয়সা রেখে গেছেন। কিনে খেতে পারবো। আমি মাকে শুধু সেমাই রান্না করতে দেখেছিলাম। দেখেছিলাম তার আড়ালে কান্নায় ভেসে আসা চোখের পানি।
সেদিন থেকে স্বপ্ন দেখি, চাকরি পেয়েই কুরবানির ছাগল কিনবো। কিন্তু চাকরি জীবনের আড়াই বছর পার হয়ে গেলেও পরিবারের খরচ সামলিয়ে একটা কুরবানির ছাগল কিনতে পারিনি। নিজের কাছে খুব অসহায় লাগে স্যার।
বস স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। খানিকটা সময় কিছু একটা ভেবে পকেট হাতড়ে ছয় হাজার মত টাকা বের করে সাইদুরের হাতে গুঁজে দিয়ে বললেন,
-এই টাকাটা তোমার ভাই হিসেবে ঈদ বোনাস দিলাম। মায়ের সাথে ঈদ করো। আমিও ছা-পোষা কর্মজীবী মানুষ। তবে পরের বছর বসকে বলে অফিস থেকে আমরা কুরবানির আয়োজন তো করতেই পারি! আমরা স্টাফরা একটু একটু করে টাকা জমাবো। যাও, মায়ের পছন্দ মত মাংস কিনবে।
সাইদুর অবাক হয়ে বসের দিকে তাকায়। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বুকে জড়িয়ে ধরে। বসের সাথে এত অন্তরঙ্গতা তো কোনোদিন করতে ইচ্ছে হয়নি তার! চোখের পানি মুছে মাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে সাইদুর। দূর গ্রামের পথ। পাশাপাশি সিটে বসেছে মা আর সে। জানালা দিয়ে যেন স্বস্তির বাতাস এসে স্পর্শ করছে তাকে। কিছুক্ষণ পর মা ওর একটা হাত আঁকড়ে ধরে বললেন,
-হাজার বিশেক টাকার পশু কুরবানি দিয়ে কয়েক টুকরো মাংস বিতরণ করলেই সেটা কুরবানি হয় বাবা? এই যে তুই নিজেকে রোজ কুরবানি করে যাচ্ছিস, এটা কী আল্লাহ দেখবে না?
সমাপ্ত
– ছুটি