ইতিহাস ঐতিহ্য

ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন: সরকার পতনের পেছনে বিএনপির ভূমিকা

  প্রতিনিধি ১৪ মার্চ ২০২৬ , ৬:২৯:০১

শেয়ার করুন

দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর ধরে বাংলাদেশে কর্তৃত্ববাদী ও ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়ে এসেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই দীর্ঘ সময়ে দলটির হাজার হাজার নেতা-কর্মী গুম, খুন, মামলা, গ্রেফতার ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্যেও দলটি রাজপথে আন্দোলন অব্যাহত রাখে এবং গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৪ সালে শুরু হওয়া ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্রথমে একটি ছাত্রভিত্তিক আন্দোলন হিসেবে শুরু হলেও পরবর্তীতে তা সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এই আন্দোলনে ছাত্রসমাজ, সাধারণ জনগণ, বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো একত্রিত হয়ে বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানের পরিবেশ তৈরি করে।

 

অনেকে এই আন্দোলনকে কেবল ছাত্রদের একক সাফল্য হিসেবে দেখলেও বাস্তবতা আরও বিস্তৃত। দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর আন্দোলন, সংগঠনিক প্রস্তুতি এবং কৌশলগত ভূমিকা এই আন্দোলনের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে অনেকের ধারণা। বিশেষ করে বিএনপির দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রাম, সাংগঠনিক নেটওয়ার্ক এবং সরকারবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান এই গণআন্দোলনের পটভূমি তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছে।

 

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে বিএনপি বহুবার বৃহৎ জনসমাবেশ, হরতাল, অবরোধসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে। তবে অতীতে অনেক সময় জনগণের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ সাহসের অভাব, রাজনৈতিক বিভাজন এবং সংগঠনের ভেতরের কিছু দুর্বলতার কারণে সেই আন্দোলনগুলো সরকার পতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।

কিন্তু ২০২৪ সালে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। ছাত্রসমাজের আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ জনগণ, রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন বিরোধী শক্তির সমন্বয় তৈরি হয়। এই সমন্বয় ও কৌশলগত আন্দোলনের ফলে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান তীব্র আকার ধারণ করে।

গুম ও নিখোঁজের ঘটনা

গুম বা জোরপূর্বক নিখোঁজ হওয়া ঘটনাও এই সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিএনপির তথ্য অনুযায়ী—
প্রায় ৪২৩ জন বিএনপি নেতা-কর্মী গুমের শিকার হয়েছেন। সূত্র:The Daily Star
তাদের মধ্যে অনেকে পরে ফিরে এলেও অনেকের এখনও কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। সূত্র:Daily Sun
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দেড় দশকে বাংলাদেশে কয়েক শতাধিক জোরপূর্বক গুমের ঘটনা ঘটেছে, যার বড় অংশ বিরোধী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত।সূত্র:bangladeshcentre.org.uk

এই গুমের ঘটনাগুলো নিয়ে দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা হয়েছে।

মামলার পাহাড়
শুধু প্রাণহানি নয়, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিপুল সংখ্যক মামলার কথাও বলা হয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে—
প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মামলা দায়ের করা হয়েছে। সূত্র :The Financial Express
এসব মামলায় প্রায় ৬০ লাখ নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়েছে। সূত্র: The Financial Express

অন্য একটি তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১,৪২,৯৮৩টি মামলায় প্রায় ৫৯ লাখের বেশি বিএনপি নেতাকর্মীকে অভিযুক্ত করা হয়। সূত্র :Daily Sun
বিরোধী রাজনীতির ওপর এটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।
আন্দোলনের ধারাবাহিকতা
বিএনপির দাবি—এই দমন-পীড়নের মধ্যেও দলটি রাজপথ ছাড়েনি।
হরতাল, অবরোধ, গণমিছিল, লংমার্চ, নির্বাচন বর্জনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির মাধ্যমে দলটি সরকারবিরোধী আন্দোলন চালিয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই দীর্ঘ আন্দোলনই শেষ পর্যন্ত সমাজে জমে থাকা ক্ষোভকে বিস্ফোরণের দিকে নিয়ে যায়, যা ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় বড় আকার ধারণ করে।

 

অনেক বিশ্লেষকের মতে,ছাত্রদের অবদান ছোট করে দেখার অবশন নেই, ছাত্র-জনতার স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পাশাপাশি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আন্দোলন, কৌশলগত পরিকল্পনা এবং বিরোধী শক্তিগুলোর মাঠে সক্রিয় উপস্থিতি—সবকিছু মিলিয়েই এই আন্দোলন সফলতার দিকে এগিয়েছে। ফলে এটি শুধু একটি ছাত্র আন্দোলন নয়, বরং ছাত্র-জনতা ও সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সম্মিলিত গণআন্দোলনের ফল হিসেবেই দেখা উচিত।


শেয়ার করুন