প্রতিনিধি ১০ মার্চ ২০২৬ , ৪:৩৩:২৫

সংবাদ:
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মো. সাইমুম রেজা তালুকদারের বিরুদ্ধে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রামে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় নিহত কলেজছাত্র ওয়াসিম আকরাম হত্যা মামলা। ওই মামলায় সাবেক এক সংসদ সদস্যকে খালাস করিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
এ অভিযোগের প্রেক্ষাপটে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় সোমবার (৯ মার্চ) পদত্যাগ করেন সাইমুম রেজা তালুকদার। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে তাকে অব্যাহতি দেয়।
একই দিন তার পদত্যাগের খবর প্রকাশের পর ‘ঘুষ দাবির’ অভিযোগসংবলিত দুটি কথিত অডিও ক্লিপ ফাঁস হয়, যা একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচার করা হয়।
ফাঁস হওয়া অডিওতে চট্টগ্রামের রাউজান আসন থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের এক আইনজীবীর সঙ্গে সাইমুম রেজা তালুকদারের কথোপকথনের দাবি করা হয়েছে। সেখানে মামলা থেকে অব্যাহতি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসের বিনিময়ে এক কোটি টাকা দাবি এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের বিষয়েও আলোচনা শোনা যায় বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে ফজলে করিম চৌধুরীর আইনজীবী রেজওয়ানা ইউসুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তবে অডিওটি বাস্তবসম্মত কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এত বড় ঘটনার পেছনে কিছু না কিছু সত্যতা থাকতে পারে।
অন্যদিকে অভিযোগ ও অডিও ক্লিপের সত্যতা পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি দাবি করেছেন, এটি একটি মহলের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার এবং অডিওগুলো মিথ্যা।
ফাঁস হওয়া অডিওতে আর্থিক লেনদেনের আলোচনা ছাড়াও ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক তদবিরের বিষয়েও কথা বলতে শোনা যায়। এমনকি নতুন চিফ প্রসিকিউটরকে ‘রিজনেবল’ উল্লেখ করে তার সমর্থন পেতে বিএনপির এক সংসদ সদস্য ও এক প্রতিমন্ত্রীর মাধ্যমে তদবির করার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে বলে অডিওতে উল্লেখ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীকে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টা করার সময় গ্রেপ্তার করা হয় বলে জানিয়েছিল পুলিশ।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় চট্টগ্রামে সংঘটিত সহিংসতায় কলেজছাত্র ওয়াসিমসহ ৯ জন নিহত এবং অন্তত ৪৫৯ জন আহত হওয়ার ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সংঘটিত ওই গণহত্যার মামলায় গত ১৬ ফেব্রুয়ারি তাকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয় ট্রাইব্যুনাল।
অভিযোগের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরে মঙ্গলবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট দেন সাইমুম রেজা তালুকদার। সেখানে তিনি বলেন, কথিত দুইটি অডিও ক্লিপে তাকে জড়িয়ে এক কোটি টাকা ঘুষ দাবি ও ১০ লাখ টাকা অগ্রিম চাওয়ার যে অভিযোগ আনা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য।
তিনি আরও বলেন, একটি মামলার বিচারপ্রক্রিয়া একাধিক প্রসিকিউটরের সমন্বয়ে পরিচালিত হয় এবং তদন্ত সংস্থার প্রতিবেদন, প্রসিকিউশন টিমের প্রস্তুতি ও আদালতের স্বাধীন সিদ্ধান্তের মাধ্যমে রায় নির্ধারিত হয়। তাই একজন প্রসিকিউটরের পক্ষে এককভাবে কাউকে বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি তার পূর্বের কর্মস্থল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও গবেষণায় ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলেন। পরিবারকে সময় দেওয়া এবং গবেষণা ও লেখালেখিতে মনোনিবেশের জন্যই তিনি দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন।
এদিকে ট্রাইব্যুনালের আরেক প্রসিকিউটর ও সাইবার বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ফাঁস হওয়া অডিওগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি কি না তা এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তবে কথোপকথনের শ্বাস-প্রশ্বাসের ধরন ও বাচনভঙ্গি বিশ্লেষণে এগুলো এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে হচ্ছে।
তিনি জানান, পূর্ণাঙ্গ ভয়েস স্যাম্পল, আইপিডিআর এবং সিডিআর বিশ্লেষণের মাধ্যমে ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত সম্পন্ন হলে তবেই নিশ্চিতভাবে বলা যাবে অডিওতে কারা কথা বলেছেন এবং এর প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল।











