প্রতিনিধি ৪ জানুয়ারি ২০২৬ , ১০:১৭:০৭

বাংলাদেশে সংঘটিত বলপূর্বক গুমের ঘটনাগুলো ছিল মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশে সংঘটিত—এমন ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে গুম সংক্রান্ত কমিশন অব ইনকোয়ারির চূড়ান্ত প্রতিবেদনে।
রোববার (৪ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদনটি জমা দেয় কমিশন।
প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সময় উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, সদস্য বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন। এছাড়া উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও প্রধান উপদেষ্টার মুখ্য সচিব সিরাজউদ্দিন মিয়াও উপস্থিত ছিলেন।
কমিশন জানায়, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে গুমের ঘটনাগুলো ছিল পলিটিক্যালি মোটিভেটেড ক্রাইম। কমিশনের কাছে মোট ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ জমা পড়ে।যাচাই-বাছাই শেষে এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯টি ঘটনাকে সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৮৭টি ঘটনা ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে।
কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস জানান, প্রকৃত গুমের সংখ্যা চার থেকে ছয় হাজার পর্যন্ত হতে পারে। অনেক ভিক্টিম বা তাদের পরিবার এখনও অভিযোগ করেননি। কেউ কমিশনের কার্যক্রম সম্পর্কে জানেন না, কেউ দেশ ছেড়ে গেছেন, আবার অনেকে ভয় বা অনিচ্ছার কারণে অন রেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, জীবিত ফিরে আসা গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবির এবং ২২ শতাংশ বিএনপি ও তাদের অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। অন্যদিকে যারা এখনও নিখোঁজ, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।
কমিশনের তদন্তে আরও উঠে এসেছে, একাধিক হাই-প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। এসব ঘটনার মধ্যে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানের নাম উল্লেখযোগ্য।
কমিশন জানায়, বহু গুমের ক্ষেত্রে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নিজেই নির্দেশদাতা ছিলেন। এছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতীয় ভূখণ্ডে অবৈধভাবে রেন্ডিশনের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনুমতি ছাড়া সম্ভব নয়।
প্রতিবেদন গ্রহণ করে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এটি জাতির জন্য একটি ঐতিহাসিক দলিল। তিনি এই ঘটনাগুলোকে “পৈশাচিক” আখ্যা দিয়ে বলেন, গণতন্ত্রের মুখোশ পরে কীভাবে একটি রাষ্ট্র জনগণের ওপর নৃশংসতা চালাতে পারে—এই রিপোর্ট তার প্রামাণ্য দলিল।
তিনি আরও বলেন, যারা এসব ভয়াবহ অপরাধ ঘটিয়েছে, তারা সমাজে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছে—এটাই সবচেয়ে আতঙ্কজনক। জাতিকে এই অন্ধকার অধ্যায় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং যেন ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা আর ফিরে না আসে, সে জন্য কার্যকর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান উপদেষ্টা কমিশনকে সুপারিশমালা ও ভবিষ্যৎ করণীয় তুলে ধরার নির্দেশ দেন এবং রিপোর্টটি সহজ ভাষায় সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আহ্বান জানান। পাশাপাশি ‘আয়নাঘর’-এর বাইরে যেসব স্থানে বিচারবর্হিভূত হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো ম্যাপিং করার নির্দেশ দেন।
কমিশনের তথ্যমতে, বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সিগঞ্জ এলাকাতেও লাশ গুমের একাধিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
শেষে কমিশনের সদস্যরা প্রধান উপদেষ্টার দৃঢ় অবস্থানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত ও সার্বিক সহায়তা ছাড়া এই তদন্ত সম্ভব হতো না। তারা জাতীয় মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠন এবং ভিক্টিম ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বানও জানান।











